গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপির) সমাবেশে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় চাজন নিহত হয়েছে। নিহতদের মৃতদেহ গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ঘটনায় পুলিশসহ আহত অনেককে নেয়া হয়েছে।
নিহতরা হলেন- গোপালগঞ্জ শহরের উদয়ন রোডের বাসিন্দা দীপ্ত সাহা (২৫), কোটালীপাড়ার রমজান কাজী (১৮), টুঙ্গীপাড়ার সোহেল রানা (৩০) ও গোপালগঞ্জ সদরের ইমন (২৪)।
গোপালগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করে বলেন, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় বেশ কয়েকজন হাসপাতালে আনা হয়েছিল। এরমধ্যে চারজন মৃত ও পুলিশ-সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত রয়েছেন।
গোপালগঞ্জের ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জীবিতেষ বিশ্বাস জানিয়েছেন, ‘এখন পর্যন্ত চার জনের মৃতদেহ হাসপাতালে এসেছে। তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। মোট চারজনের মৃত্যু হয়েছে।’
পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী বুধবার (১৬ জুলাই) দুপুরে দিকে গোপালগঞ্জ শহরের পৌরপার্ক এলাকায় রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচির আয়োজন করে এনিসিপি। সে কর্মসূচীতে অংশ নিতে বুধবার গোপালগঞ্জে যান এনসিপির নেতার। নেতারা পৌছানোর আগেই সেখানে হামলা চালিয়ে মঞ্চ ভাংচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির পদযাত্রা ও সমাবেশকে ঘিরে বুধবার সকাল থেকেই উত্তেজনা ছিল গোপালগঞ্জে। সকল বাধা উপেক্ষা করে সমাবেশে যোগদেন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহসহ শীর্ষ প্রায় সব নেতা।
সমাবেশ শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পদযাত্রায় হামলা চালায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ঘটে। হামলার জেরে হামলাকারী ও পুলিশের মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। এতে বাজার এলাকা থেকে পাচুড়িয়া পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কে রণক্ষেত্র পরিণত হয়।
পুলিশ বাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। এ সময় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের গাড়িবহর লক্ষ্য করে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। এছাড়া বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে হামলাকারিরা।
এনসিপি নেতাদের অভিযোগ, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে এনসিপির সমাবেশ মঞ্চে হামলা চালায় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। দুপুরের দিকে শহরের সমাবেশস্থলে তারা হঠাৎ করে মিছিল নিয়ে এসে মঞ্চে চড়াও হয়। এ সময় সাউন্ড বক্স, মাইক ও চেয়ার ভাঙচুর করার পাশাপাশি এনসিপির উপস্থিত নেতাকর্মীদেরও মারধর করে তারা। তখন হামলাকারিরা কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়।পরে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের হামলার কারণে গোপালগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আশ্রয় নেন এনসিপির নেতারা।
গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেছেন, বুধবার দুপুর আড়াইটার পরে এনসিপি তাদের কর্মসূচি শেষ করে যাওয়ার সময় শহরের লঞ্চ ঘাট এলাকায় গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের সামনে এই হামলার ঘটনা
তিনি বলেন, এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্থানীয় জনতা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা এসময় হামলাকারীদের উদ্দেশ্যে রাবার বুলেট ও টিয়ারসেল ছোঁড়ে। মুহুর্তের মধ্যে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ওই এলাকা এবং সংঘর্ষ সারা শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
মুহম্মদ কামরুজ্জামান আরো বলেন, ‘গোপালগঞ্জে এনসিপির পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য জেলাজুড়ে অনির্ষ্টিকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। পরবর্তীতে রাত ৮টা থেকে পরের দিন বৃহস্পতিবার ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনায় জেলা শহরসহ আশপাশ এলাকায় ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্থানীয় জনতা জেলা কারাগারে হামলা করে। তারা কারাগারের প্রধান ফটক ভাঙার চেষ্টা করে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের প্রতিহত করে। এ সময় এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির নেতাকর্মীরা গোপালগঞ্জ ছেড়ে গেছেন। সেনাবাহিনী ও পুলিশের পাহারায় তাদের ১৫ থেকে ১৬টি গাড়ির বহর গোপালগঞ্জ ছাড়েন। এই বহরে এনসিপি নেতাদের মধ্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, হাসনাত আব্দুল্লাহ, সারজিস আলমসহ শীর্ষ নেতারা রয়েছেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, এনসিপির নেতাকর্মীদের একত্র করে সেনা পাহাড়ায় বাগেরহাটের প্রবেশদ্বার মোল্লারহাট সেতু পার করে দিয়েছেন।
বুধবার রাতে খুলনা প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ বলেন, “মুজিববাদি সন্ত্রাসিরা জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং তার নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে জঙ্গি কায়দায় হামলা করেছে। তিনি হামলার ঘটনায় জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
নাহিদ ইসলাম বলেন, “সভা শেষে মাদারীপুর যাওয়ার সময় আমাদের গাড়ি বহরে হামলা চালায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় পরে আমরা খুলনা চলে আসি।”
তিনি বলেন, “দেশ ও বিশ্ববাসীর কাছে আওয়ামী লীগের চেহার আজকের ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে।”
গোপালগঞ্জ “ফ্যাসিস্টদের আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠেছে” বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
খুব পরিকল্পিতভাবে গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের ওপর হামলা করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কেউ কর্মসূচি করতে পারবে না সেই মিথ আজকে এনসিপি ভেঙে দিয়েছে।
গোপালগঞ্জে রাত আটটা থেকে শুরু হয়েছে কারফিউ। চলবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত।
স্থানীয় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্ধ্যার পরই অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে গোপালগঞ্জ শহর। ঘরে ফেরা কয়েকজন মানুষকে বিচ্ছিন্নভাবে রাস্তায় দেখা গেলেও তাদের চোখেমুখেও ছিল আতঙ্ক।
শহরজুড়ে টহল দিচ্ছে র্যা ব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি উপস্থিতির কথাও বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন তারা।
পুলিশ বলছে, পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে। নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে বাড়তি নজরদারিও করা হচ্ছে।
এনসিপির সভা ঘিরে কয়েক ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষের পর গোপালগঞ্জে কারফিউ জারি করেছে সরকার। রাত ৮টা থেকে পরদিন বিকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
গোপালগঞ্জের ঘটনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিবৃতি:
এনসিপি’র কর্মসূচি ঘিরে গোপালগঞ্জে সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে একথা বলা হয়েছে।
গোপালগঞ্জে সহিংসতার প্রেক্ষাপটে বুধবার বিকেলে অন্তর্বতী সরকারের তরফ থেকে এই বিবৃতি দেয়া হয়।
বিবৃতিতে আরো জানানো হয়, গণ অভ্যুত্থান আন্দোলনের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে তরুণ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশে বাধা দিয়ে তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। নিষ্ঠুর আক্রমণের মাধ্যমে ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি, পুলিশ ও গণমাধ্যমের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে।
”নিষিদ্ধ ঘোষিত ছঅত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগ অ্যাকটিভিস্টদের এই জঘন্য কর্মকাণ্ড বিনা বিচারে ছেড়ে দেওয়া হবে না। দায়ীদের দ্রুত চিহ্নিত করা হবে এবং বিচার নিশ্চিত করা হবে। বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের ওপর এরকম সহিংসতা করার জায়গা নেই,” বলা হয়েছে বিবৃতিতে।
এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ায় সেনাবাহিনী এবং পুলিশের প্রশংসা করা হয়েছে বিবৃতিতে। এছাড়া হুমকির পরও সমাবেশ চালিয়ে যাওয়ায় কর্মসূচির আয়োজকদের প্রশংসা করা হয়।
গোপালগঞ্জে সংঘর্ষের ঘটনায় মির্জা ফখরুলের উদ্বেগ প্রকাশ:
গোপালগঞ্জে এনসিপি’র পূর্বঘোষিত ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিতে হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ”ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর দুষ্কৃতিকারীরা আবারো দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিসহ নৈরাজ্যের মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। আজ গোপালগঞ্জে এসসিপি’র পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির ওপর বর্বরোচিত হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, ইউএনওসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশ সদস্যদের আহত করার বর্বর ঘটনা সেই অপতৎপরতারই বহিঃপ্রকাশ।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কারণে আওয়ামী দোসররা মরণকামড় দিয়ে ইন্টেরিম গভর্নমেন্টকে বেকায়দায় ফেলে ফায়দা লুটতে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এসব দুষ্কৃতিকারীতের কঠোর হস্তে দমন ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই,” তিনি বলেছেন ওই বিবৃতিতে।
হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।
মন্তব্য