![]()
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাতে দলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেওয়া হয়।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর দলের চেয়ারম্যান পদটি শূন্য হয়। এই প্রেক্ষিতে বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির এক বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে শূন্য পদে তারেক রহমানকে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর মাধ্যমেই তিনি দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের হাল ধরলেন।
স্থায়ী কমিটির জরুরি সিদ্ধান্ত
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাতে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাটি পূর্বনির্ধারিত না থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তারেক রহমানকে দলের পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, তারেক রহমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন। দলীয় গঠনতন্ত্রের ৭-এর ‘গ’ ধারায় (৩) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের কর্তব্য, ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রসঙ্গে বলা আছে ‘যেকোনো কারণে চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান চেয়ারম্যানের অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে বহাল থাকবেন।’
দলীয় গঠনতন্ত্রের ৭-এর ‘গ’ ধারার (৩) উপধারা অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান উক্ত পদে স্থলাভিষিক্ত হবেন-এই বিধান মেনেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে শীর্ষ নেতৃত্বের হাল ধরলেন।
আজ শুক্রবার রাতে দলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তারেক রহমানের ছবি সংযুক্ত ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুজনিত কারণে দলের চেয়ারম্যান পদটি শূন্য হয়। এ প্রেক্ষিতে বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় স্থায়ী কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে শূন্য পদে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে জনাব তারেক রহমানকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এর মাধ্যমে তিনি দলীয় গঠনতন্ত্র অনুসারে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।’
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান
এর আগে গত ৪ জানুয়ারি সিলেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, দ্রুতই তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হবে।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হওয়ার পর থেকে তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। গত ৩০ ডিসেম্বর বেগম জিয়ার প্রয়াণে পদটি শূন্য হওয়ার পর দলীয় নেতৃত্বে এই আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন আনা হলো।
নির্বাসন থেকে ফেরা ও রাজনৈতিক পরিক্রমা
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। তার এই প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে দলের নেতাকর্মীদের মাঝে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের অবসান ঘটে।
১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তারেক রহমান। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বড় সন্তান। আশির দশকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের সময় মায়ের নির্বাচনি কার্যক্রম তদারকির মাধ্যমে তার সক্রিয় রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের বিজয়ের পর তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
২০০২ সালে তাকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয়, যা দলের ভেতরে তার বড় উত্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০৯ সালে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০১৮ সালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।
চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নেতৃত্ব
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ ও নির্যাতনের অভিযোগের পর ২০০৮ সালে লন্ডনে চলে যান তিনি। পরে সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় পান। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ বিভিন্ন মামলায় তাকে দণ্ডিত করা হলেও, সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তিনি অধিকাংশ মামলা থেকে আইনগতভাবে অব্যাহতি পান।
তারেক রহমানের এই দায়িত্ব গ্রহণকে বিএনপির তৃণমূল ও শীর্ষ নেতারা নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন। তারা আশা করছেন, তারেক রহমানের সরাসরি নেতৃত্বে দল আরও সুসংগঠিত হয়ে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে।
মন্তব্য