![]()
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ৫ মার্চ, ২০২৬
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে চীনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই দুই মিত্রকে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একজনের কারাবাস এবং অন্যজনের মৃত্যুতে বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হলেও বেইজিংয়ের ভূমিকা এখন পর্যন্ত কেবল ‘নিন্দা’ ও ‘উদ্বেগ’ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রশ্ন উঠেছে-এক সময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাব বিস্তারকারী পরাশক্তি চীন কি তবে এখন কেবলই নীরব দর্শক?
কারাকাস থেকে তেহরান: ট্রাম্পের ঝটিকা অভিযান
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস থেকে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর এক গোপন অভিযানে নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই তেহরানের কেন্দ্রস্থলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি।
উভয় ঘটনায় বেইজিং কড়া ভাষায় নিন্দা জানিয়ে একে ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন’ ও ‘শাসন পরিবর্তনের অপচেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তেহরানের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তাও পুনর্ব্যক্ত করেছে তারা। তবে কূটনৈতিক বা সামরিকভাবে বড় কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি বেইজিংকে।
সি চিনপিংয়ের ‘কঠোর বাস্তববাদ’
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং এখন ‘কঠোর বাস্তববাদ’ বা হার্ড রিয়ালিজম নীতি অনুসরণ করছেন। এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে:
১. ট্রাম্প-সি সম্মেলন: চলতি মাসের শেষের দিকে বেইজিংয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সি চিনপিংয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বড় কোনো অবনতি চায় না চীন।
২. কৌশলগত সুবিধা: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যস্ততা বৃদ্ধি পেলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ওয়াশিংটনের মনোযোগ ও চাপ কমবে। এটি বেইজিংয়ের আঞ্চলিক স্বার্থের জন্য অনুকূল।
৩. ঝুঁকি এড়ানো: ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ’-এর পরিচালক ক্রেগ সিঙ্গেলটনের মতে, “চীন কথায় দীর্ঘ হলেও ঝুঁকিতে সংক্ষিপ্ত।” অর্থাৎ, তারা মুখে সমর্থন দিলেও মিত্রদের জন্য সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি নেবে না।
ইরান চীনের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হলেও তা দেশটির অস্তিত্বের জন্য অত্যাবশ্যক নয়। ফলে বেইজিং বড় কোনো ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়। উপরন্তু, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি সামরিক ব্যস্ততা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ওয়াশিংটনের মনোযোগ ও সামরিক সমাবেশ কমিয়ে দিতে পারে—যা বেইজিংয়ের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ’-এর চীনবিষয়ক পরিচালক ক্রেগ সিঙ্গেলটন বলেন, ‘চীন কথায় দীর্ঘ, আর ঝুঁকিতে সংক্ষিপ্ত।’ অর্থাৎ জাতিসংঘে ইরানের পক্ষে বক্তব্য দিলেও তেহরানকে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার ঝুঁকি নেবে না বেইজিং।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিকল্প পথ
ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। তাদের সমুদ্রপথে আমদানিকৃত তেলের ১৩ শতাংশই আসে ইরান থেকে। খামেনির প্রয়াণের পর সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও বেইজিং খুব একটা বিচলিত নয়। চীন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হলেও সামরিক সহযোগিতা সীমিত। বরং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের দিক থেকে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত।
কারণ:
• চীনের কাছে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের জরুরি মজুত রয়েছে, যা ১১৫ দিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
• রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানির বিকল্প পথ তাদের হাতে রয়েছে।
• তবে ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে, কারণ চীনের মোট তেলের এক-তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে আসে।
বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট?
বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্য নীতি অনুসরণ করে—একদিকে ইরান, অন্যদিকে সৌদি আরবের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। ২০২৩ সালে ইরান-সৌদি সম্পর্ক সামাজিকীকরণেও চীনের মধ্যস্থতা ছিল।
চীন সবসময় নিজেকে একটি ‘শান্তিপ্রিয় বিকল্প শক্তি’ হিসেবে জাহির করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের রাজনীতির সমালোচনা করে। তবে মিত্রদের চরম সংকটে চীনের এই নিষ্ক্রিয়তা বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে চীন কি কেবল ‘অর্থনৈতিক মিত্র’ হিসেবেই থাকবে, নাকি প্রকৃত ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টর’ হয়ে উঠবে-সেই প্রশ্নটিই এখন বিশ্ব রাজনীতিতে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
বেলজিয়ামভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ-এর বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেছেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়ে চীনের আসলে কোনো লাভ নেই। গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যে বাণিজ্যিক সমঝোতা ও স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, তা ঝুঁকিতে ফেলতে চায় না বেইজিং।
তবে এই সীমিত সহায়তা চীনের ওপর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। নিরাপত্তা ইস্যুতে যারা বেইজিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারা এখন ভাবতে পারে—সংকটে পড়লে চীন কি পাশে থাকবে?
বর্তমানে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি মূলত হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা। সৌদি আরব ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল এই পথ দিয়ে চীনে যায়, যা চীনের মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করে। কিন্তু এখন এই প্রণালির উত্তর অংশে ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং আইআরজিসির এক উপদেষ্টার হুমকি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও নৌপথের নিরাপত্তার আহ্বান জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, পরিস্থিতিকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবেও দেখছে চীন। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর সম্পৃক্ততা ইন্দো-প্যাসিফিকে চাপ কমাতে পারে। একই সঙ্গে বেইজিং এখন ‘হস্তক্ষেপ করে না’ এমন শান্তিপ্রিয় বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছে—যেখানে ওয়াশিংটনকে দেখানো হচ্ছে ‘আধিপত্যবাদী’ শক্তি হিসেবে। তবে সংকট সহিংস রূপ নিলে চীন সীমিত সক্ষমতা দেখাবে—এ কথাও মানতে নারাজ চীনা বিশ্লেষকেরা।
মন্তব্য