আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ৫ মার্চ, ২০২৬
ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ব্যাপক বিমান হামলা বা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র এক সপ্তাহ পার হতে না হতেই বড় ধরনের সংকটে পড়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। পেন্টাগনের অত্যাধুনিক ও নির্ভুল লক্ষ্যভেদী (প্রিসিশন) অস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসায় এখন কপালে ভাঁজ পড়েছে ওয়াশিংটনের সমরবিদদের। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কোন লক্ষ্যবস্তুকে আগে রক্ষা করা হবে, তা নিয়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
অস্ত্রের মজুত নিয়ে পেন্টাগনে উদ্বেগ
সংশ্লিষ্ট তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পেন্টাগন যে হারে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যয় করছে, তা ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ইরানের ২ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, “সবচেয়ে শক্তিশালী আঘাতগুলো আসা এখনও বাকি।” তবে পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন বলছে, ইতিমধ্যে ‘প্যাট্রিয়ট’ এবং ‘থাড’ (THAAD)-এর মতো বিশ্বের সেরা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শত শত ইন্টারসেপ্টর ব্যয় হয়ে গেছে। এছাড়া ব্যালিস্টিক মিসাইল সাইটগুলো লক্ষ্য করে বিপুল সংখ্যক টমাহক ক্রুজ মিসাইল ছোড়া হয়েছে, যা মজুতের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে।
পাল্টা আঘাতে ইরানের ‘ব্যয় চাপিয়ে দেওয়ার’ কৌশল
অন্যদিকে, ইরানও দমে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তারা বাহরাইন, কুয়েত, ইরাক, ইসরায়েল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হাজার হাজার ড্রোন এবং শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
• মার্কিন সেনা নিহতঃ কুয়েতে ড্রোন হামলায় অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।
• দূতাবাসে হামলাঃ রিয়াদ ও কুয়েত সিটিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো ইরানি হামলার শিকার হয়েছে।
• ইসরায়েলে ক্ষয়ক্ষতিঃ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এলাকার বেশ কিছু ভবন বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
লক্ষ্য যখন ‘শাসন পরিবর্তন’ থেকে ‘অবকাঠামো ধ্বংস’
‘মিডল ইস্ট আই’-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ‘শক অ্যান্ড অ’ (Shock and Awe) কৌশলে দ্রুত তেহরানের শাসনব্যবস্থায় ধস নামানো। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কয়েক দিনের তীব্র হামলার পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ নেই, বরং তারা দ্রুত পুনর্গঠিত হয়ে সংঘাতকে আঞ্চলিক মাত্রায় ছড়িয়ে দিয়েছে।
এই বাস্তবতায় মার্কিন প্রশাসন তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনছে:
1. লক্ষ্য পরিবর্তন: শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থেকে কিছুটা সরে এসে এখন ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করার দিকে জোর দিচ্ছেন মার্কো রুবিও।
2. দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি: মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ একদিকে বলছেন এটি “অন্তহীন যুদ্ধ নয়”, আবার অন্যদিকে স্বীকার করেছেন সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
3. নেতানিয়াহুর আশ্বাস: ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভিযান সঠিক পথে এগোচ্ছে বলে দাবি করলেও, ইরানকে দ্রুত কোণঠাসা করার পরিকল্পনা যে সফল হয়নি, তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
কৌশলগত সংকট
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হওয়ার ধারণা দিলেও, অস্ত্রের এই দ্রুত ঘাটতি ওয়াশিংটনকে কৌশলগতভাবে চাপে ফেলে দিয়েছে। সীমিত মজুত দিয়ে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়া এখন পেন্টাগনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইরান মূলত ‘অ্যাট্রিশন ওয়ারফেয়ার’ বা ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর বিশাল অর্থনৈতিক ও সামরিক ব্যয় চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে।
মন্তব্য