
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ০৭ মে, ২০২৬
ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্রশাসক মো: শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ করায় মামলার বাদীকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন মহামান্য হাইকোর্ট। একইসঙ্গে বাদীর করা রিট আবেদনটিও খারিজ করে দিয়েছেন আদালত।
গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের একটি দ্তৈ বেঞ্চ এ আদেশ দিয়েছেন।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, গাজীপুর মহানগরীর ২৪নং ওয়ার্ডের চতর বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. শহিদুল ইসলাম ২০২১ সালে একটি রিট পিটিশন (নং ৬৩৮৯/২০২১) দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, রাস্তা নির্মাণের সময় তাঁর বাড়ীর জমির ক্ষতি করা হচ্ছে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে তিনি আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে একটি ‘কনটেম্পট পিটিশন’ (নং ২৪২/২০২৪) দায়ের করেন।
পরে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং বিচারপতি মো. মাহবুব উল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বৈত বেঞ্চ তখন স্থিতাবস্থার আদেশ দিয়েছিলেন।
উক্ত পিটিশনে বিবাদী করা হয় তৎকালীন স্থানীয় সরকার সচিব মোঃ ইব্রাহিম, তৎকালীন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক আবুল ফাতেম মোঃ শফিকুল ইসলাম ও তৎকালীন গাজীপুর সিটি মেয়র জায়েদা খাতুনকে।
কিন্তু ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর চলতি বছরের ৫ মার্চ আদালত ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার তথা গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো: শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীকে সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ মেনে তিনি ব্যক্তিগতভাবে হাজিরা দেন।
আদালতে দাখিলকৃত সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের অভ্যন্তরীণ রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় চতর বাজার এলাকায় ২০ ফুট প্রশস্ত রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছিল। তবে শহিদুল ইসলামের রিট আবেদনের পর আদালতের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাঁর বাড়ির সামনের অংশে কোনো জমি দখল করা হয়নি।
তদন্তে প্রমাণিত হয়, বাদীর বাড়ির উত্তর ও দক্ষিণ পাশে ২০ ফুট রাস্তা থাকলেও তাঁর বাড়ির সামনে বিদ্যমান ১৪ ফুট জায়গাতেই রাস্তা মেরামত করা হয়েছে। নির্মাণকাজে বাদীর কোনো স্থাপনার ক্ষতি করা হয়নি এবং তাঁর ব্যক্তিগত কোনো জমিও দখল করা হয়নি। বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার (২৪ অক্টোবর ২০২৪) আগেই প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ আদালতের নির্দেশ মেনেই সম্পন্ন হয়েছিল।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য প্রমানে দেখা যায়, আদালত গত ২২/০৮/২০২১ হতে ০৬ (ছয়) মাসের জন্য স্থিতাবস্থার রুল জারি করেন। অতপর আদালত গত ২২/০২/২০২২ মোকদ্দমা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্থিতাবস্থার রুল জারি করেন। পরবর্তীতে ১৯/০৩/২০২৪ মামলার বাদীকে অবহিত করে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন হতে সরেজমিনে তদন্ত করা হয়। বাদী সরেজমিনে উপস্থিত ছিলেন।
তদন্তে দেখা যায়, বাদীর বাড়ির কোন ক্ষতিসাধন না করে বাদীর বিল্ডিং ঘেঁষে চলমান রাস্তাটি যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায়ই নির্মাণ করা হয়। উল্লেখ্য, বাদীর বাড়ির উত্তর ও দক্ষিণের দিকে জনগনের বিনা বাধায় বা স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছায় ২০ ফুট রাস্তা নির্মাণ করা হয় এবং আদালতের আদেশ অমান্য না করে বাদীর বাড়ির সামনে ১৪ ফুট রাস্তা নির্মাণ করা হয়।
মামলার বাদী মোঃ শহিদুল ইসলাম রিট পিটিশন ৬৩৮৯/২০২১ এর পরিপ্রেক্ষিতে কনটেম্পট পিটিশন নং ২৪২/২০২৪ দায়ের করেন। মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের গত ২৮/০৮/২০২৪ তারিখের শুনানি শেষে আদালত অবমাননার জন্য আদেশ প্রদান করা করা হয়।
উল্লেখ্য, উল্লিখিত সময়ে তৎকালীন মেয়র জায়েদা খাতুন দায়িত্বরত ছিলেন। পরবর্তীতে উক্ত কনটেম্পট পিটিশন নং ২৪২/২০২৪ এর ০৫/০৩/২০২৬ তারিখের আদেশে জিসিসি প্রশাসক শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীকে ৪নং বিবাদী হিসেবে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য আদেশ প্রদান করা হয়। যদিও তিনি গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক হিসেবে গত ২৪/১০/২০২৪ তারিখ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
শুনানি শেষে আদালত দেখতে পান যে, বিভাগীয় কমিশনার বা গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ আদালতের কোনো আদেশ অমান্য করেননি। বরং বাদী সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এই মামলা করেছেন।
সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মহিউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে সব কাজ সম্পাদন করার পরেও বাদী এই মিথ্যা মামলাটি করার কারণে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ব্যক্তিগতভাবে স্বশরীরে আদালতে হাজিরা দিয়েছেন।
তিনি আরো জানান, উচ্চ আদালতের দ্বৈত বেঞ্চ এসময় মিথ্যা মামলা করার কারণে আদালত উস্মা প্রকাশ করেন। মিথ্যা মামলার কারণে অনেক সময় অনেক সরকারি কর্মকর্তাকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
পরে বিবাদী পক্ষে রিট পিটিশনটি খারিজ এবং বাদীকে জরিমানার আবেদন করলে বিজ্ঞ আদালত সন্তুষ্ট হয়ে, রিট পিটিশনটি খারিজ করে দেন এবং বাদিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দেন।
তিনি আরো বলেন, আদালতে শুনানীর সময় বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেল উপস্থিত থেকে আদালতকে সহায়তা করেছেন।
আদালত সংশ্লিষ্ট সবাইকে সরকারি কাজে অহেতুক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার বিষয়ে সতর্ক করেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্রশাসক মো: শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমরা সব সময় দায়িত্ব পালনকালে উচ্চ আদালতের নির্দেশেনা যথাযথভাবে অনুসরণ করে থাকি। আমাদের লক্ষ থাকে সরকারের নিয়ম-কানুন ঠিক রেখে মানুষকে সেবা প্রদান করা।
তিনি বলেন, যতদিন জিসিসির প্রশাসক ছিলাম, ততদিন সতত্যা, ন্যায়-নিষ্ঠার সাথে সরকারের গৃহীত উন্নয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ণ করার চেষ্টা করেছি। সামর্থ্যের সবটুকু ব্যবহার করে নগরবাসীর সেবা করেছি। কারো প্রতি কোন অন্যায় করা হয়নি।
মন্তব্য