![]()
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর| ১৪ মে, ২০২৬
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় স্ত্রী ও তিন কন্যাসহ একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ঘাতক ফোরকান মোল্লা (৪০) পদ্মা সেতু থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেলে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য নিশ্চিত করেন গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মোঃ শরীফ উদ্দিন।
পুলিশ জানায়, ঘাতক ফোরকান মোল্লা পেশায় একজন প্রাইভেটকার চালক। গত ৮ মে দিবাগত রাতে কাপাসিয়ার রাউতকোনা পূর্বপাড়া গ্রামে নিজের ভাড়া বাসায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটান তিনি। নিহতরা হলেন, ফোরকানের স্ত্রী শারমিন (৩৫), তার তিন কন্যা মীম (১৬), মারিয়া (০৮), ফারিয়া (০২) এবং শ্যালক রসূল মোল্লা (২২)।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, তদন্তে জানা গেছে, গত ৮ মে শ্যালককে গার্মেন্টস চাকরি দেওয়ার কথা বলে গোপালগঞ্জ থেকে গাজীপুরে নিয়ে আসেন ফোরকান। এরপর রাতের খাবারের সঙ্গে চেতনানাশক মিশিয়ে পরিবারের সবাইকে অচেতন করে চুরি দিয়ে চারজনের গলা কেটে ও সবার ছোট কন্যাকে স্বাসরোধে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা ছুরিসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই ফোরকান পলাতক ছিলেন।
পুলিশ সুপার আরো জানান, হত্যাকাণ্ডের পর গাজীপুর জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তিনটি চৌকস দল তদন্তে নামে। ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা ছুরিসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করা হয়। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যোবায়েরের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম গত ১১ মে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় মেহেরপুর সদর এলাকা থেকে একটি ট্রাকের চালকের সহকারীর কাছ থেকে ফোরকানের মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
তিনি আরো জানান, তদন্তে জানা যায়, ১১ মে সকাল আনুমানিক ০৬:৫০ ঘটিকায় পদ্মা সেতুর মাঝামাঝি স্থানে রেলিংয়ের পাশে ফোনটি পড়ে থাকতে দেখে একজন ট্রাকচালকের সহকারী পদ্মা সেতুর রেলিংয়ের পাশ থেকে ফোনটি কুড়িয়ে পেয়েছিলেন।
পুলিশ সুপার আরো জানান, পদ্মা সেতুর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১১ মে সকাল ৬টা ৪২ মিনিটে একটি সাদা প্রাইভেটকার থেকে সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরিহিত এক ব্যক্তি সেতুর মাঝামাঝি স্থানে নামেন। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর তিনি রেলিং টপকিয়ে পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দেন।
![]()
তিনি জানান, যদিও নিহতের স্বজনরা ফুটেজ দেখে ঝাঁপ দেওয়া ব্যক্তিটি ফোরকান কি না তা শতভাগ নিশ্চিত করতে পারেননি, তবে তারা জানিয়েছেন ব্যক্তিটি দেখতে ফোরকানের মতোই। মোবাইল কুড়িয়ে পাওয়ার স্থান ও ঝাঁপ দেওয়ার স্থান একই হওয়ায় আমাদের জোরালো ধারণা, ওই ব্যক্তিই ঘাতক ফোরকান। তবে, এখনো লাশ উদ্ধা্র করা যায়নি। লাশ উদ্ধারের পর ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
মামলার তদন্তের সাথে সম্পৃক্ত একটি দায়িত্বশীল সূত্র নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, ঘটনার পর কাপাসিয়ায় ফোরকানের মোবাইলের লাস্ট কলের সময় ছিল শনিবার ভোর সোয়া ৪টায়। ঘটনার পর ফোরকান তার বড় ভাই জব্বারকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভয়েস ম্যাসেজ পাঠায়। তদন্তকারীরা সে ভয়েস ম্যাসেজটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।
সূত্র জানায়, সেই ভয়েস ম্যাসেজে ফোরকানকে বলতে শুনা যায়,“আমি স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালকসহ সবাইকে মেরে ফেলেছি। আমাকে তোমরা আর খুঁজো না, আমাকে আর পাবে না।”
সূত্র আরো জানায়, হত্যাকান্ড ঘটানোর পর ফোরকান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এলাকা ত্যাগ করেন। ফোরকান কাপাসিয়া থেকে একটি প্রাইভেট কার ভাড়া নিয়ে ঢাকার মালিবাগ এলাকায় যায়। সেখান থেকে একটি সিএনজি ভাড়া নিয়ে ফোরকান ভোরে ঢাকার মুক্তাঙ্গণ এলাকায় যায়। সেখান থেকে ফোরকানের আত্মীয় মারা গেছে, তিনি পদ্মা সেতু এলাকায় যাবেন বলে ৬ হাজার টাকায় একটি প্রাইভেটকার ভাড়া করে পদ্মা সেতু এলাকায় গিয়ে সেতুর মাঝখানে প্রাইভেটকার থেকে নেমে যান। পরে সেতু থেকে নদীতে ঝাপ দেন।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপারের আরো উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফফাক উজ্জামান, আবুল খায়ের, আমিরুল ইসলাম, তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মো: যোবায়ের।
পুলিশ জানায়, ফোরকানের মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা ও ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য