সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬ , ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩

সেকশন

 

টিকটকের ফাঁদ ও দুই কিশোরী নিখোঁজ: ঘরে ফেরার গল্পে এক নির্মম সাবধানবাণী

গণবাণী ডট কম
প্রকাশ: ৩ জুন ২০২৬, ২৩:৪৯:৫৫ | পঠিত: ২২৬

---

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর।  ৩রা জুন, ২০২৬:

গাজীপুরের শ্রীপুরের পূর্ব নিজ মাওনা গ্রামের সোহেল রানার ঘরটা গত শনিবার হঠাৎ করেই নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। চৌদ্দ বছরের সানজিদা আর তেরো বছরের আতিয়া—পিঠাপিঠি দুই বোন এক নিমেষে উধাও। কোনো পারিবারিক অশান্তি নয়, এই নিখোঁজ হওয়ার পেছনে কাজ করেছে ভার্চুয়াল দুনিয়ার এক ভয়ঙ্কর মায়াজাল। এক টিকটকারের রঙিন প্রলোভনে পা দিয়ে, সামান্য অভিমানে নিজেদের চেনা ঘর ছেড়ে অজানা-অচেনা পথের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিল তারা।

কোমলমতি শিশুরা হয়তো ভেবেছিল পর্দার ওপারের জগৎটা বুঝি আরও বেশি সুন্দর। কিন্তু কিছুদূর যেতেই সেই মায়াজাল কেটে যায়, চারপাশের চেনা দুনিয়াটা বদলে যায় এক চিলতে আতঙ্কে। চেনা পথ ভুলে দিকবিদিকশূন্য দুই বোনের শেষ ঠিকানা হয় নিজ জেলা থেকে বহুদূরের জামালপুর জেলায়।

নিশ্চিত কোনো বড় বিপদের মুখে পড়ার আগেই এই দুই বোনের জীবনে আলো হয়ে আসেন জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী। মেয়ে দুটির অসহায়ত্ব দেখে তিনি ফেসবুকে একটি মানবিক পোস্ট দেন।

সেখানে তিনি লেখেন: “পথ ভুলে চলে আসা এই মেয়ে দুটিকে আমরা পেয়েছি… তারা দুই বোন। ছোট বোন পূর্ব নিজ মাওনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে এবং বড় বোন গাজীপুর উচ্চবিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। কোনো কারণে তারা কারো মোবাইল নম্বর বলছে না অথবা মনে করতে পারছে না। মেয়ে দুটি এখন জামালপুর ‘অপরাজেয় বাংলাদেশ’-এর শেল্টার হোমে আছে…”

পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তা নজরে আসে জামালপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ ইউসুফের। তিনি কালক্ষেপণ না করে দ্রুত যোগাযোগ করেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূঁইয়ার সাথে। ঘরের মেয়েদের ঘরে ফেরাতে এরপর শুরু হয় এক যৌথ ও দ্রুতগতির প্রশাসনিক তৎপরতা।

গাজীপুরের ডিসি তাৎক্ষণিকভাবে সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য শ্রীপুরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নাহিদ ভূঁইয়াকে নির্দেশ দেন। ইউএনও দ্রুততার সাথে মাঠে নেমে ফরাজিপাড়া ও বিএনপি বাজার সংলগ্ন পূর্ব নিজ মাওনা গ্রাম থেকে মেয়ে দুটির নাম-ঠিকানা নিশ্চিত করেন এবং তাদের পিতা-মাতাকে ডেকে এনে বিষয়টি জানান।

অবশেষে গত মঙ্গলবার, নিখোঁজ হওয়ার ঠিক দুই দিন পর, উভয় জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপে ও বিশেষ ব্যবস্থাপনায় সানজিদা ও আতিয়াকে তাদের মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জামালপুরের ‘অপরাজেয় বাংলাদেশ’ শেল্টার হোম থেকে বিশেষ সুরক্ষায় এনে তাদের মা-বাবার কোলে তুলে দেওয়া হয়।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ নূরুল করিম ভূঁইয়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, “আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী, এ দুই অভিমানী মেয়ের কোনো ক্ষতি হয়নি। অপরাজেয় বাংলাদেশ শেল্টার হোমে তারা নিরাপদ ছিল এবং বেশিদূর পথহারা হতে হয়নি। এ ধরনের ঘটনা আমাদের বারবার অভিভাবক সচেতনতার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।”

তবে শুধু ফিরিয়ে দিয়েই প্রশাসন তাদের দায়িত্ব শেষ করেনি। এই দরিদ্র পরিবারের মেয়ে দুটির পড়াশোনা যাতে অর্থের অভাবে বন্ধ না হয়, সেজন্য গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঞা শ্রীপুরের ইউএনও-কে এই গরীব দুই কন্যার পড়াশোনার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

⚠️ একটি জরুরি সাবধানবাণী: আপনার সন্তান কি নিরাপদ?

সানজিদা আর আতিয়া ভাগ্যবতী, কারণ তারা কোনো মানবপাচারকারী বা পেশাদার অপরাধ চক্রের হাতে পড়ার আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে পেরেছিল। কিন্তু সব গল্পের শেষটা এত সুন্দর হয় না। প্রতিদিন কত শিশু-কিশোরী এভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের রঙিন ফাঁদে পা দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকার গলিতে, তার হিসাব মেলানো ভার।

এই ঘটনা আমাদের সমাজের প্রতিটি পরিবারের সামনে কিছু তীব্র ও নির্মম প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে:

• ভার্চুয়াল জগতে নজরদারি: আপনার সন্তান ঘরের কোণে বসে স্মার্টফোনে কী দেখছে, কার সাথে কথা বলছে, আপনি কি তার খবর রাখছেন? সন্তান আপনার চোখের সামনে বসে থাকলেও সে কিন্তু ভার্চুয়াল জগতের সুবাদে হাজার মাইল দূরের কোনো অপরাধীর পাতা ফাঁদে জড়িয়ে পড়তে পারে।

• টিকটক ও লাইকির ছদ্মবেশী মায়াজাল: লাইক, কমেন্ট আর অনুসারী (Followers) বাড়ানোর নেশা কিংবা অচেনা ‘সেলিব্রিটি’দের প্রলোভন আমাদের কোমলমতি কিশোর-কিশোরীদের বিবেক কেড়ে নিচ্ছে। অপরিচিত কারো রঙিন কথায় ঘর ছাড়ার এই প্রবণতা এক ভয়ানক সামাজিক ব্যাধি।

• অভিমান বনাম বন্ধুত্বের দূরত্ব: সন্তানদের সাথে পারিবারিক দূরত্ব বা তাদের ওপর অতিরিক্ত শাসন অনেক সময় তাদের বাইরের জগতের প্রতি বেশি আকর্ষিত করে। মা-বাবাকেই হতে হবে সন্তানের সবচেয়ে বড় বন্ধু, যেন যেকোনো সমস্যার কথা তারা সবার আগে ঘরে এসে বলতে পারে।

• প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার: জাহাঙ্গীর আলমের একটি ফেসবুক পোস্ট এবং নেটিজেনদের শেয়ারের কারণেই আজ একটি পরিবার ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। প্রযুক্তিকে ধ্বংসের হাতিয়ার না বানিয়ে এভাবে জীবন বাঁচানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

সানজিদা আর আতিয়া আবার স্কুলে ফিরবে, তাদের কলকাকলিতে মুখরিত হবে পূর্ব নিজ মাওনা গ্রাম। কিন্তু এই ঘটনা যেন প্রতিটি অসচেতন মা-বাবার চোখের ঘুম কেড়ে নেওয়ার মতো এক চিরন্তন সতর্কবার্তা হয়ে থাকে। আজই সচেতন হোন, আপনার সন্তানকে সময় দিন—নাহলে ক্ষণিকের উদাসীনতা সারাজীবনের কান্না হয়ে ফিরতে পারে।

মন্তব্য

সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর

Developed By: Dotsilicon
শিরোনাম:   গাজীপুরে ডিবি পুলিশের হানা: চোলাই মদের কারখানা সিলগালা, বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামসহ মদ জব্দ কাপাসিয়ায় সেনাবাহিনীর মানবিক উপহার: বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ পেয়ে হাসল এক হাজার অসহায় মুখ শেখ হাসিনার দেশে ফিরে সরাসরি আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নেই: চিফ প্রসিকিউটর দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন-সম্পদ রক্ষাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার অপরাধমুক্ত গাজীপুর গড়তে ডিবি পুলিশকে ২৪ ঘণ্টা মাঠে থাকতে হবে: জিএমপি কমিশনার মানবিক দৃষ্টান্ত: গাজীপুরের ৫ এমপি ও সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে গাজীপুরে আসন্ন রথযাত্রা উপলক্ষে মতবিনিময় সভা শিক্ষার মানোন্নয়নে একীভূত প্রশ্নপত্র ও গবেষণায় মেধাবীদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ: গাজীপুরে শিক্ষামন্ত্রী গাজীপুরে শহীদ জিয়া ফুটবল টুর্নামেন্ট: টাইব্রেকারে বিকেএসপি চ্যাম্পিয়ন টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রকে জাতীয় সেন্টারে রূপান্তর করা হবে: সমাজকল্যাণমন্ত্রী